হাওরের প্রাথমিক শিক্ষায় নজর দিন
- আপলোড সময় : ২৯-০৮-২০২৬ ০৭:২৬:১৫ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৯-০৮-২০২৬ ০৭:২৬:১৫ পূর্বাহ্ন
শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড- এ কথা বহুল উচ্চারিত। কিন্তু সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর বাস্তব চিত্র যেন সেই কথাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। শিক্ষক অনুপস্থিতি, শিক্ষক সংকট, সময়মতো বিদ্যালয় না খোলা, নির্ধারিত সময়ের আগেই ছুটি, দুর্বল অবকাঠামো এবং তদারকির অভাবে প্রাথমিক শিক্ষার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এর সরাসরি শিকার হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
জেলার ১ হাজার ৪৭৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার। অথচ প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য। ৪৫১টি প্রধান শিক্ষক এবং ১ হাজার ১৬২টি সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য থাকা নিঃসন্দেহে বড় সংকট। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে মাত্র একজন শিক্ষক দিয়ে শতাধিক শিক্ষার্থীর পাঠদান ও দাপ্তরিক কাজ চালানো হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যে কঠিন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আরও দুঃখজনক। সকাল সাড়ে ৯টার পরও বিদ্যালয় তালাবদ্ধ থাকা কিংবা নির্ধারিত সময়ের আগেই বিদ্যালয় ছুটি দেওয়ার ঘটনা কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। শিক্ষক স্বল্পতা বাস্তব সমস্যা, কিন্তু দায়িত্বশীলতার ঘাটতি দিয়ে তার ব্যাখ্যা চলে না। একটি বিদ্যালয়ের দরজা খোলা আছে কি না - এটুকু নিশ্চিত করতেও যদি কার্যকর তদারকি না থাকে, তাহলে বৃহত্তর শিক্ষার মানোন্নয়ন কীভাবে সম্ভব?
অবকাঠামোগত দুরবস্থাও ভয়াবহ। জেলার ১৮৭টি বিদ্যালয়ের অবস্থা নাজুক। কোথাও ভবনের ছাদ ও দেয়ালে ফাটল, কোথাও পলেস্তারা খসে পড়ছে, আবার কোথাও বৃষ্টি হলে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করার পরও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় শিক্ষার্থীদের সেখানেই পাঠ নিতে হচ্ছে - এটি শুধু অব্যবস্থাপনা নয়, শিশুদের নিরাপত্তার প্রতিও চরম অবহেলা।
প্রাথমিক শিক্ষায় এই অবস্থা চলতে থাকলে ঝরে পড়ার হার আরও বাড়তে পারে। বর্তমানে জেলায় ঝরে পড়ার হার ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান না হলে এবং নিরাপদ ও আকর্ষণীয় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এ পরিস্থিতিতে শুধু নতুন শিক্ষক নিয়োগের আশ্বাস যথেষ্ট নয়। শূন্যপদ দ্রুত পূরণ, দুর্গম বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদায়নে বিশেষ অগ্রাধিকার, নিয়মিত ও কার্যকর পরিদর্শন এবং দায়িত্বে অবহেলার ক্ষেত্রে কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন দ্রুত সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি বিকল্প শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা করতে হবে।
হাওরাঞ্চলের শিশুরা কোনোভাবেই শহরের শিশুদের চেয়ে কম সুযোগের অধিকারী নয়। ভৌগোলিক দুর্গমতা তাদের শিক্ষার অধিকারকে খর্ব করার অজুহাত হতে পারে না। শিক্ষা ব্যবস্থার এই সংকটকে ‘হাওরের স্বাভাবিক সমস্যা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে একটি প্রজন্মের শিক্ষাজীবনের ক্ষতি পূরণ করা কঠিন হবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়